অভিশপ্ত রাত
রফিক উদ্দিন লস্কর (নিতাইনগর-হাইলাকান্দি, আসাম-ভারত)
আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগের ঘটনা। সেই রাতের ঝড়বৃষ্টির কথা এখনও সাহেদের মনে আয়নার মতো। সেই অভিশপ্ত রাতটা সাহেদদের জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। সাহেদদের পরিবারে তিন ভাই, দুই বোন ও মা, এ নিয়ে তাদের সংসার। কয়েকদিন আগে তাদের বাবা মারা গেছেন এক রোড এক্সিডেন্টে। সেই শোক এখনও কাটেনি, সাহেদ পরিবারের বড়ো ছেলে। পড়াশোনার সাথে সাথে জীবন সংগ্রামেও ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে সাহেদকে অল্প বয়সে। শান্তির নীড়ে মায়ের মুখ একমাত্র সম্বল। মায়ের মুখ সেই অতীতের ফেলা ব্যথা বেদনাকে অনেক সময় হালকা করে নেয়। সংসারের টান পোড়েন এ তেমন কিছু নয়। কিন্তু বাবার মৃত্যুর চেয়েও সেই অভিশপ্ত ঝড়ের রাতটার যন্ত্রনা সাহেদদের পরিবারকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। স্কুল, কলেজ বা রুটি রুজির তাগিদে সাহেদ যখন বের হয় তখন তার ঔৎসুক্য চোখ দু'টি কি যেনো চারপাশ দিয়ে খুঁজতে থাকে। তবে তার আত্মবিশ্বাস তাকেই জিয়েই রেখেছে।
দিন যায় বছর যায়, সাহেদের ভবঘুরে মন একচিলতেও ঘুমোতে যায় না। সারাদিন কর্মব্যস্ততা তার আড়ালেও আরেকটা মন সবসময় কি যেনো খুঁজতে থাকে। কে জানে তার সেই খোঁজার মতলব! কাউকে কিছু খুলেও বলেনি। জীবনের তেরোটা বছর পার হলো, সাহেদের সংসারের চিত্রও বদলাতে থাকে। উৎসব পার্বন আসলেও তার মন প্রায়ই আনন্দ বিমুখ থাকে। বন্ধু বান্ধবদের বিবাহ বা অন্যান্য নিমন্ত্রণ রক্ষা সাহেদ, মনের আড়ালে বসে থাকা একটা বিচ্ছেদ যন্ত্রণার অকাট্য অস্ফুটস্বর তাকে বেদম প্রহার করে। কে জানে তার ভাগ্যের চাকা আর দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে একদিন ঠোঁটে গোলাপের মতো হাসি ফোটে আনন্দ অশ্রুতে অবগাহন করবে সে।
সেদিন সাহেদের বন্ধু আরমানের বিয়ে, মহা ধুমধাম। শহরের এক নামি-দামি হোটেল বিবাহের আয়োজন। সন্ধ্যা পরে বরযাত্রী, সেও সহযাত্রী হয়ে রওনা দিল। সন্ধে সাতটায় সবাই বিবাহভবনে গিয়ে পৌঁছল, হৈ-হুল্লোড় আর জনসমাগমও যেনো সাহেদের মনকে নাড়া দিতে পারেননি। একটা জীবন্ত পুতুলের মতো সাহেদ তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছে। খাওয়া দাওয়ার ঠিক নেই, জীবনের রুঠিন অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বিবাহ অনুষ্ঠানে এসেছে বলে আজ রাত আটটায় তার রাতের খাবার প্রায় সম্পন্ন। পাশের টেবিলে বসা কনেপক্ষের দু'জন ভদ্রলোক, ওরা গল্পচ্ছলে বলছেন যে আজ পরহেজগার পাগলীটাও আসেনি, না জানি কোথায় আছে! সাহেদের কানে অকটু অস্পষ্টভাবে সেই কথাটা ভেসে আসলো। খাবারটা তাড়াতাড়ি শেষ করে একজন ভদ্রলোকের সাহেদ কানের কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে শুধালো চাচা!...পাগলীজন কোথায় থাকেন? কত বৎসর থেকে?... ভদ্রলোক জানালেন সামনে একটা চৌরঙ্গী আছে তার ঠিক বাঁদিকের দোকানের বারান্দায় আজ প্রায় দেড় বছর থেকে আছেন।
সাহেদ চৌরঙ্গীর দিকে রওনা দিলো, বিদ্যুতের গতির মতো তার পা দুটি চলতে থাকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা দু মিনিটে অতিক্রম করলো। সবশেষে সেই দোকানের বারান্দায় গিয়ে সাহেদ পৌঁছল, একটু এদিক ওদিক চেয়ে আস্তে আস্তে মহিলার কাছে গিয়ে বসলো। ঘুমটা পরা মুখ, পরণের শাড়িটাও তেমন ময়লাযুক্ত নয়। সাহেদের মনের জানালায় একটু শীতল বাতাসের যেনো ছোঁয়া লাগছে, মনের শক্তি প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। আলো-আঁধারির জীবনের পাতায় যেনো নতুন করে কোন কিছু জুড়তে যাচ্ছে সেই ভেবে সাহেদ পাগলীজনকে মা সম্বোধন করে বললো, মা! আপনার মুখটা দেখার খুব ইচ্ছে করছে, দেখাবেন? সাহেদের কণ্ঠস্বর পাগলীর নাড়িতে যেনো টান দিলো , কে তুমি বাবা!? বাড়ি কোথায়? আমি সাহেদ, বাড়ি মোহনপুর। সাহদের মুখ থেকে বাক্য শেষ হতে না হতে পাগলীজন তাকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন, সাহেদও কান্না আটকাতে পারেনি। তিনবছর থেকে জমানো কান্নার যবনিকা টেনে সাহেদ তার মা'কে নিয়ে বিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো। বিয়ে বাড়ির আনন্দে আরেকটা আনন্দ সামিল করে রাত দশটায় নিজের বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো।
----------------------×××--------------------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন